আমাদের ব্লগ

মিশরের নীল নদের তীরে জন্মানো এক কিশোর কখনও ভাবেনি বিংশ শতাব্দীর আশ্চর্য্যতম বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব তার হাতে এসে পরবে। আজ থেকে ৫১ বছর আগে ২০, জুলাই ১৯৬৯ সালে চাঁদের মাটিতে পা পড়েছিল মানুষের।
সেই অ্যাপোলো ১১ মিশনে যখন নীল আর্মষ্ট্রংরা মাত্র ষাট সেকেন্ডের জ্বালানী নিয়ে চাঁদে নামলেন তখন পৃথিবীর মাটি চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছিলেন নাসার লুনার ল্যান্ডিং সিলেকশন কমিটির প্রধান ফারুক এল–বাজ।
প্রফেসর এল–বাজ এবং তাঁর সহকারীদের প্রধান দায়িত্ব ছিল উপগ্রহচিত্রকে বিশ্লেষণ করে চাঁদের বুকে অবতরণ করার সঠিক জায়গাটি চিহ্নিত করা। যেকোনো মহাকাশ অভিযানেই এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেদিন তিনি সফল হয়েছিলেন, অ্যাপোলো ১১ চাঁদের মাটি নেমে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।
সত্তরের দশকে যখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই প্রতিদ্বন্ধী পুঁজিবাদি আমেরিকা ও সাম্যবাদী রাশিয়ার মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চলছে তখন মিশরের মতো সোভিয়েত সমর্থনকারী একটি দেশের বিজ্ঞানী এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেল কীভাবে? এই প্রশ্ন সত্যিই বেশ জটিল।
ফারুক এল–বাজ জন্মেছিলেন ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দের ২রা জানুয়ারী মিশরের জাগাজিগ প্রদেশে। ছোটো থেকেই মেধাবী এল–বাজ ২০ বছর বয়সে রসায়ন ও ভূতত্বে স্নাতক হয়ে আমেরিকায় পড়তে যান। সেখানকার মিস্যুরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্বে মাস্টার্স করেন এবং পরে সেখান থেকে পিএইচডি লাভ করেন।
এই সময় তিনি মিশরে ফিরে এলেও পছন্দমতো শিক্ষকতার কাজ না পেয়ে ফিরে যান আমেরিকায়। সেখানে যে কাজ পান তার সুবাদেই অ্যাপোলো মিশনে আমন্ত্রণ পান। সেই সময়ের টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থায় তাঁর ওই পদ পাওয়া নিয়ে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, “সেই সময় একটাই রাস্তা ছিল, আমি যেটাই করি সেটাকে নিখুঁত ভাবে করতে হবে।“
অ্যাপোলো অভিযান শেষ হলে ডঃ এল–বাজের খ্যাতি ছড়িয়ে পরে অ্যামেরিকা জুড়ে। তাঁকে একাধিক পদে কাজ করার আমন্ত্রণ জানানো হয়। ১৯৭২ সালে তিনি অ্যামেরিকার জাতীয় মহাকাশ মিউজিয়ামের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন নাসার চন্দ্রসংক্রান্ত বিষয়ের নামকরণ শাখারও সদস্য নির্বাচিত হন।
তারপরের বছরই ডঃ এল–বাজকে নাসার তরফ থেকে অ্যাপোলো–সয়ূজ প্রজেক্টের পৃথিবী নিরীক্ষণ এবং উপগ্রহচিত্র বিভাগের প্রধান করা হয়। আমেরিকা–রাশিয়ার যুগলবন্দি এই প্রজেক্ট ডঃ এল–বাজের বৈজ্ঞানিক কর্মজীবনকে আরও পটু করে তোলে।
মহাকাশ গবেষণার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত থাকলেও ফারুক এল–বাজ বরাবরেরই ভূতাত্ত্বিক। জীবনের প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার বিশেষ সুযোগ না পেলেও গত তিরিশ বছর সমান তালে কাজ করে চলেছেন। প্রৌঢ়তা বার্ধক্যে পরিণত হলেও তাঁর কাজের প্রতি উৎসাহ এবং কৌতুহল কোনোটাই কমেনি।
বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উপগ্রহচিত্র থেকে ভূমিরূপ এবং তার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর কাজের বেশীরভাগটাই মরূভূমি কেন্দ্রিক ফলে প্রায়শই মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন গবেষণার কাজে।
প্রফেসর এল–বাজের আবিষ্কারের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ব হলো কুয়েত অ্যাটলাস এবং গিজা তত্ব। তাঁর ধারণা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সময় এমন কোনো নদী ছিল যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে একটি রেখায় জুড়ত, তিনি সেই নদীর নাম দেন কুয়েত।
গিজার পিরামিড সম্পর্কে প্রফেসর বাজের ধারণা, পিরামিডের ওই গঠনের পিছনের মূল কারণ হলো, তখনকার মিশরীয়রা জানত যে ওই আকৃতির ভূমিরূপে কখনও ভূমিক্ষয় হয়না, শতাব্দীর পর শতাব্দী একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানী তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে সারা বিশ্বের প্রশংসা পেয়েছেন এবং মুসলমান সমাজকেও এক নতুন আলো দেখিয়েছেন।
সূত্র: ইন্টারনেট