আমাদের ব্লগ

বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ তৈরীতে মুসলমানদের অবদা
বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ তৈরীতে মুসলমানদের অবদা

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ, সম্মানিত পাঠকবৃন্দ আপনাদেরকে আজকে স্বাগত জানাচ্ছি “বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ গঠনে মুসলমানদের অবদান” (আইজিএসআরসি) IGSRC এর ২য় পর্বে ।

বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করেছে পুরো মুসলিম জাতি। হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করেছে অনেক মানুষ। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা জন্ম দিয়েছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। বাঙালি মুসলমানের দুটি বড় অহংকারের জায়গা রয়েছে। একটি তার দেশ, অন্যটি ভাষা।

শুধু বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের মূলেই নয়, বাংলা ভাষা এবং বাংলা সনের বা ফসলি সনের মূলেও রয়েছে ইসলাম তথা মুসলমানদের ঐতিহাসিক ভূমিকা। বাংলাদেশের শহরে বসবাসকারী আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে ইংরেজ শাসনামলে চালু হওয়া খ্রিস্টীয় সন অদ্যাবধি ব্যাপক চালু থাকলেও বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনো বাংলা সন বা ফসলি সন ব্যাপকভাবে প্রচলিত। গ্রামের আপামর জনসাধারণ এখনো তাদের কৃষিকাজ থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করেন বাংলা সন বা ফসলি সনের ভিত্তিতে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের পীর-মাশায়েখদের অধিকাংশ ইসালে সওয়াব ওয়াজ মাহফিল প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হয় বাংলা হিজরি সন মোতাবেক আবার অনেক যায়গায় দেখা যায় যে (ফসলি) সনও ব্যাবহার করে থাকে।

এমনিতে ইসলামী সকল ধর্মানুষ্ঠান তো হিজরি সন মোতাবেকই অনুষ্ঠিত হয় বাস্তবতার তাগিদে। তদুপরি বাংলাদেশের গ্রামের মানুষদের অধিকাংশ কর্মকান্ড পরিচালিত হয় যে বাংলা ফসলি সনের হিসাবে, সে বাংলা সনের জন্মও হয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনামলে। মধ্যে কিছু দিন বাংলা সনের গননা জ্যোতির্বিদদের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ড. শহীদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে সংস্কার সাধনের পর বাংলা সন এখন বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রচলিত রয়েছে। সুতরাং বাস্তবতা বিবেচনায় দাবি করা যায়, যে বাংলা সন বাংলাদেশের নিজস্ব সন হিসেবে সুপরিচিত, তার মূলেও রয়েছে ইসলামের তথা মুসলমানদের অবদান।

এবার আসা যাক বাংলা ভাষার কথায়। ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান অবলম্বন। এই ভাব প্রকাশ আবার সবচেয়ে সহজ হয় মাতৃভাষার মাধ্যমে। পৃথিবীতে কোনো বড় ঘটনা হঠাৎ রাতারাতি সংঘটিত হয় না। ভাষার জন্মের ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। বাংলা ভাষা আজ যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে সে পর্যায়ে পৌঁছতে বহু সময় লেগেছে। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আসনে বসাতে আমাদের বহু সংগ্রাম ও রক্তদান করতে হয়েছে এ কথা আমরা সবাই জানি। এই সংগ্রামের স্মৃতি হিসেবে সারা বিশ্বে এখন একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত “বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মুসলমানদের দান” শীর্ষক এক সেমিনার আয়োজিত হয়েছিলো গত (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১) তারিখে। সেমিনারটি করেছিলো ‘ একটি ভাষা গবেষণা সংস্থা’। এবং সে প্রোগ্রামের নিউজ দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকে এসছিলো। যথেষ্ঠ তথ্য উপাত্ত ছিলো সে নিউজে,

সেন রাজারা শুধু মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টিকারী জাতিভেদ প্রথাই প্রবর্তন করে না, তারা সাধারণ জনগণের ব্যবহৃত বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ও ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। তারা সংস্কৃতকে রাজভাষা ঘোষণা করে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করতে থাকে। তাদের এ মনোভাবে উৎসাহিত হয়ে ব্রাহ্মণ পত্নিরা তাদের ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সংস্কৃতকে দেবতার ভাষা এবং বাংলাকে সাধারণ মানুষের ভাষা হিসেবে আখ্যায়িত করে জারি করা এমনি একটি সংস্কৃত শ্লোক ছিল নিম্নরূপঃ-

অষ্টাদশ পুরান রামায়োন্যাম চরিতানিচো
ভাষায়ং মানবং শ্রুত রৌঢ়ব নরকং ব্রজেত।

অর্থাৎ (তারা প্রচার করতো) যারা বাংলা ভাষা অষ্টাদশ পুরান ও রামায়ণ শ্রবণ করবে তাদের স্থান হবে রৌঢ়ব নরকে

হাজার বছর আগে বাঙ্গালি জাতির মুখের ভাষা ‘বাংলা’কে কেড়ে নিয়েছিলো দক্ষিণ ভারত থেকে আগত সেন রাজারা। সেন রাজাদের হিন্দু পণ্ডিতরা ফতওয়া জারি করেছিলো, “যারা বাংলা ভাষা বলবে ও শুনবে তারা ‘রৌঢ়ব’ নামক নরকে যাবে।”

বাংলা ভাষা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব মুসলমানদের দান মুসলমানরা না থাকলে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব থাকতো না

সৌভাগ্যক্রমে এই রাষ্ট্রীয় সামাজিক পটভূমিতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজী বাংলা জয় করেন। বাংলাদেশে সুমলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় জাতিভেদ-লাঞ্ছিত তদানীন্তন সমাজেই শুধু বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয় না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির ইতিহাসেও এক গৌরবময় অধ্যায়ের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

ঐ সময় তুর্কি বংশোদ্ভূত ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজী নির্যাতিত বাঙালীদের মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন এবং ১২০৪ সালে মাত্র ১৮ জন ঘোড়সওয়ারী নিয়ে সেন রাজাকে পরাজিত করে বাংলাকে স্বাধীন করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলাজীর বাংলা বিজয়ের মাধ্যম দিয়ে সেইদিন শুধু ভূমির বিজয় হয়নি, সাথে মুক্ত হয়েছিলো বাঙ্গালীদের মুখের ভাষা ‘বাংলা’।

ড. দীনেশ চন্দ্র সেন এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছে যে, “মুসলমান সম্রাটগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ-সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা।”

গবেষক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান উনার বইয়ে লিখেছেন, “যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় ত্বরান্বিত না হতো এবং এদেশে আরো কয়েক শতকের জন্য পূ্র্বের শাসন অব্যাহত থাকতো, তবে বাংলা ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যেত এবং অবহেলিত ও বিস্মৃত-প্রায় হয়ে অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হতো।”

চলবে ইনশাল্লাহ…