আমাদের ব্লগ

বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ তৈরীতে মুসলমানদের অবদান

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ, সম্মানিত পাঠকবৃন্দ আপনাদেরকে আজকে স্বাগত জানাচ্ছি “বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশ গঠনে মুসলমানদের অবদান” (আইজিএসআরসি) IGSRC এর ৩য় পর্বে ।

বাংলা ভাষার জন্ম শৈশব-কৈশোরে এ ভাষার লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেন মুসলমান শাসকবৃন্দ।

মধ্যযুগে মুসলিম শাসকদের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষার যে সাহিত্য চর্চা শুরু হয়, তার মাধ্যমে বাংলা ভাষা একটি পরিপূর্ণ ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার যোগ্যতা অর্জন করে।
মধ্যযুগে মুসলিম শাসন আমলে বাংলা ভাষার দ্বার উন্মুক্তকরণ ও স্বাধীন চর্চা শুরু হওয়ার পরও একটি দল ১২০০ থেকে ১৩৫০ সনকে বাংলা ভাষা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলে দাবী করে বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চায়। অথচ এ সময় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা পরিস্ফুটনের সুযোগ পায়। তাইতো ১২০০ থেকে ১৩৫০ সনকে বাংলার সাহিত্যের অন্ধকার যুগ না বলে বাংলা ভাষার পরিস্ফুটনের সময়কাল হিসেবে আখ্যায়িত করার দাবীও জানিয়েছেন অনেকে।

বাংলা ভাষাকে কলুষিত করার চেষ্টা পরবর্তীতে যুগে যুগে আরো হয়। ১৮শ’ সনে ব্রিটিশরা কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বাংলা ভাষার আরবী ও ফারসী শব্দ বাদ দিয়ে সংস্কৃত শব্দ প্রবেশের উদ্দেশ্যে সাহিত্য চর্চা শুরু করে। তারা দেখাতে চায়, “বাংলা ভাষার সাথে মুসলমানদের কোন সম্পর্ক নেই”।

মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করতে প্রচার করা হয়, বাংলা ভাষায় প্রথম কুরআন শরীফ অনুবাদ নাকি গিরিশ চন্দ্র সেন করেছে। অথচ ১৮৮৬ সালে গিরিশ চন্দ্র সেনের অনুবাদের বহু পূর্বে ১৮০৮ সালে বাংলা ভাষায় কুরআন শরীফের আংশিক অনুবাদ করেন মাওলানা আমীরুদ্দীন বসুনিয়া। এরপর ১৮৩৬ সনে মৌলভী নাঈমুদ্দীন পূর্ণাঙ্গ কুরআন মাজীদের বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন করেন। অথচ এ ইতিহাস প্রচার করা হয় না।

আধুনিককালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা উঠলে প্রথম নাম আসে ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নাম। সংগঠনটি সর্বপ্রথম ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে। তাদের দেখানো পথেই পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলন তৈরী হয়, ঘটে ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারী। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি জন্ম নেয়া মুসলিম ছাত্রলীগও এ আন্দোলনে যোগ দেয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ এ দুটি সংস্থার উদ্যোগে সারা পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে ভাষা রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে প্রথম সফল অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। অভ্যুত্থানের জের চলে কয়েক দিন ধরে। ফলে প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ১৫ মার্চ ভাষা সংগ্রামীদের সব দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য হন।

যে নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালে ভাষা সংগ্রামীদের সব দাবি মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেন তিনি ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঢাকা সফরে এসে পল্টন ময়দানে এক জন সভার ঘোষণা করে বসেন : উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। ফলে জনগণের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। এর ফলই ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির প্রতিবাদ দিবস।

আমরা আগেই বলেছি, উপমহাদেশের প্রত্যন্ত পূর্বাঞ্চলে বিশাল মুসলিম জনগণ গড়ে না উঠলে আজকের স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্মই সম্ভব হতো না। একইভাবে আমরা দেখেছি আজকের যে বাংলা সন তার জন্ম হয় মুসলমানদের শাসনামলে। অপরদিকে বাংলা ভাষার শৈশব-কৈশোরে এর লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেছেন মুসলিম শাসকগণ।

শুধু তাই নয়, বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার জন্য যারা রক্ত দিয়েছে তারা সবাই মুসলিম তরুণ। পৃথিবীতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়েছে একমাত্র যে দেশটি সেটিও একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ, বাংলাদেশ।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মুলসমানদের দান হওয়ার পরও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বার বার মুসলিম বিবর্জিত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য মুসলিম কবি সাহিত্যিকের অগণিত রচনা-কবিতা থাকার পরও পাঠ্যবইগুলোতে মুসলিমদের রচনা-কবিতা নেই বললেই চলে, থাকলেও খুবই সামান্য। পাঠ্য বইয়ে মুসলিম লেখক কবিদের সামান্য বিচরণ দেখে নুতন প্রজন্ম আসল ইতিহাস অনুধাবন করতে পারে না। নতুন প্রজন্ম ভুল ধারণা করে বসে, “বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বোধহয় অমুসলিমদের ভাষা।”

গত ৬শ’ বছরের বাঙ্গালি মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের রেখে যাওয়া সাহিত্যগুলো পুনঃপ্রকাশ করা হলে এই বাঙ্গালি নতুন প্রজন্ম বাঙ্গালির জাতি আদি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারতো, যা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। নতুন প্রজন্ম জানতে পারতো, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে মুসলমানদেরই সম্পর্ক ছিলো।

মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের রচনাসমূহ ছিলো নৈতিকতা ও শিক্ষনীয় ঘটনা সমৃদ্ধ, অপরদিকে অমুসলিমদের অধিকাংশ রচনায় নারী-পুরুষের প্রণয় ও জৈবিক ঘটনাবলী প্রাধান্য পায়। মুসলিম সাহিত্যিকদের সাহিত্য আড়াল করে অন্যদেরটা চর্চা করার প্রভাব সমাজে পড়ে। বর্তমান সময়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি বলতে নারী-পুরুষের প্রণয়সহ জৈবিক ঘটনাবলী বেশি প্রাধান্য পায়।

অমুসলিম সাহিত্যিকদের সাহিত্য আমাদের পর্যাপ্ত নৈতিকতা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তৈরী হয়েছে এক ধরনের শূন্যস্থান। আর সেই শূন্যস্থান দিয়েই প্রবেশ করেছে পশ্চিমা শিল্প-সংস্কৃতির প্রভাব, সৃষ্টি হয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসণ। বর্তমান নতুন প্রজন্ম বাংলা শিল্প-সংস্কৃতি রেখে পশ্চিমা সংস্কৃতির দিকে আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ বাঙ্গালী মুসলিম কবি-সাহিত্যিকদের নৈতিকতা সমৃদ্ধ সাহিত্য চর্চাকে লুকিয়ে রাখা। মুসলিম সাহিত্যিকদের পুরাতন সাহিত্যগুলো যদি পুনরুদ্ধার ও প্রচার করা সম্ভব হয়, তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৈতিকতা চর্চা অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

সুতরাং বাংলা সন বাংলাভাষা, স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ এ তিনেরেই মূলে রয়েছে মুসলমানদের অনেক ঐতিহাসিক অবদান।

আজকের মতো এ পর্যন্তই পরবর্তিতে ইনশাল্লাহ আবার আলোচনা হবে মুসলমানদের অন্য কোন এক ইতিহাস নিয়ে।