আমাদের ব্লগ

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান

মহাগ্রন্থ আল-কোরআন বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। জ্ঞান-বিজ্ঞান সাধনা ও গবেষণায় আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাইতো কোরআনকে বিজ্ঞানময় কিতাব বলে অভিহিত করেছেন। কোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ৯৭টি সুরায় ৩৫৫ আয়াতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়ে উল্লেখ আছে। প্রখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী Hartwig Hirschfield তাঁর New Researches in to the Composition and Exegesis of the Quran গ্রন্থে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন। কোরআন সব বিজ্ঞানের প্রধান উৎস)।

আল-কোরআনের সুরা মায়িদাহ এর ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করল, সে গোটা মানবজাতিকে রক্ষা করল…।’

দেড় হাজার বছর আগের মহান আল্লাহর এই বাণীর সত্যতা আমরা এখনো প্রতিনিয়ত অনুধাবন করছি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি, প্রসার ও মানুষের জীবন রক্ষার জন্য ওষুধ আবিষ্কারের পেছনে নিঃসন্দেহে মুসলিম বিজ্ঞানীদের আছে অনন্য অবদান। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি রচনায় মুসলিম বিজ্ঞানীরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থার আবিষ্কার, রোগীসেবার নিয়ম-পদ্ধতি প্রণয়ন, হাসপাতাল এবং ফার্মেসি প্রতিষ্ঠায় ইসলামের অপরিসীম অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

চিকিৎসাপদ্ধতি উদ্ভাবন, যেমন—চর্মরোগ, গলার রোগ এবং ঘুমজনিত অসুস্থতা নিরসনে অনন্য অবদান রেখেছেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। আল রাজি (৮৪১-৯২৬) নবম শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি বিস্ময়কর নাম। তিনি মোট ৩৫ বছর চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। রাজি চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পর্কে ১১৭টি গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি হাম, শিশুরোগ সম্পর্কে নতুন মতবাদ প্রবর্তন করেন। আল-রাজি স্নায়ু-দুর্বলতা, মানসিক রোগ, পক্ষাঘাত চিকিৎসার ধারণা প্রদান করেন। ইবনে জহুর (১০৯৪-১১৬৩) গ্যাস্ট্রিক টিউবের মাধ্যমে কৃত্রিম খাবারের যে ব্যবস্থাপদ্ধতি আবিষ্কার করেন, তার আজও বহুলভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইবনে আল-নাফিস (১২১২-১২৮৮) প্রথম বিজ্ঞানী, যিনি ফুসফুসসংক্রান্ত রোগের নিরাময়পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা মুখে অনুভূতিবিলোপকারী (চেতনানাশক) পদ্ধতির ধারণা দিয়েছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানুন’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাইবেল নামে খ্যাত। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনুসরণীয় চিকিৎসাবিদ্যার এই গ্রন্থে তিনি মাথাধরা, মৃগী, অবশতা, চোখ, কান, নাক, গলা এবং দাঁতের অসুখ, হূিপণ্ড এবং ফুসফুসের রোগ, পেট, অন্ত্র, যকৃৎ, পিত্ত ও প্লিহার রোগ, জ্বর, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া প্রভৃতি রোগের প্রতিকারের পদ্ধতির বিশদ বর্ণনা করেন। আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার সবচেয়ে পরিচিত বিজ্ঞানীর নাম আলী ইবনে আব্বাস (৯৩৬-১০১৩)। এই আন্দালুসিয়ান-আরব চিকিৎসাবিদ এবং বিজ্ঞানীকে ‘আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক’ বলা হয়। তিনি একজিমা, পাঁচড়া, মেছতা, গোদ, কুষ্ঠ, বসন্ত ও যৌনবিষয়ক রোগের কারণ ও প্রতিকার বিশদভাবে বর্ণনা করেন। এ ছাড়াও অনেক মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের কয়েকজন হলেন জাবির ইবনে হাইয়ান, আল-বাতরিক (মৃ-৭৯৬), আলী ইবনে রাব্বান, আবুল হাসান আত-তারাবি, হাসান ইবনে নুহ, ইসমাইল আল-জুরজানি, ইবনে রুশদ, হুনায়েন ইবনে ইসহাক (৮০৯-৮৭৭), সাবেত বিন কুরা (মৃত্যু-২৮৮ হিজরি) প্রমুখ।

হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা :
মুসলিম বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন, রোগ নির্ণয়, গবেষণা এবং গ্রন্থ রচনার মধ্যেই সীমিত ছিলেন না। তারা সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণেও অসাধারণ অবদান রাখেন। মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম প্রতিটি জি×হা×দে×র ময়দানে নিরাপদ স্থানে চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখতেন। মসজিদে নববীর আঙিনায়ও রোগীর চিকিৎসা এবং সেবার ব্যবস্থা ছিল। উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান অনেক ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীকালে ইসলামী শাসনের সময় বাগদাদ, কর্ডোভা, দামেস্ক ও কায়রোর বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল নির্মিত হয়। ইসলামী যুগে হাসপাতালের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে পশ্চিমা পণ্ডিত ড. ডানল্ড ক্যাম্বল বলেছে, ‘একমাত্র কর্ডোভায় ইসলামী শাসনামলে ৫০০ চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। মুসলিম শাসনামলে ভারতবর্ষেও অনেক আধুনিক হাসপাতাল ছিল। বাগদাদ নগরীতে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন খলিফা আফদুদ্দৌলাহ। এর পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী আল রাজি (৮৪১-৯২৬)। এসব হাসপাতালে রোগীদের ওষুধ ও খাবার বিনা মূল্যে সরবরাহ করা হতো। সাদা ধবধবে রেশমি বস্ত্র আচ্ছাদিত মনোরম পরিবেশে হাসপাতালের শয্যাগুলো থরে থরে সাজানো থাকত। প্রতিটি কক্ষে প্রবহমান বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা ছিল। গোসলখানাতে রোগীদের প্রয়োজনীয় ঠাণ্ডা ও গরম পানির ব্যবস্থা থাকত। রোগীদের দেওয়া হতো জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার পরিধেয় এবং তোয়ালে। কায়রো নগরীতে ‘মানসুর কালাউন’ হাসপাতাল ছিল জগদ্বিখ্যাত। প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ইবনে নাফিস, ইবনে আবি উসাইবা, ইবনে রিদওয়ান প্রমুখ পণ্ডিতরা ছিলেন এই হাসপাতালের অভিজ্ঞ চিকিৎসক। ফার্মেসি প্রতিষ্ঠায়ও মুসলমানদের ভূমিকা ছিল অগ্রগামী।

সত্যিকার অর্থে বিজ্ঞানের অবদানের ক্ষেত্রে ইসলামের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য।

সূত্র:
Die Medizin Im Koran
New Researches in to the Composition and Exegesis of the Quran
kalerkantho